ওষুধের সঠিক ব্যবহার, ডোজ ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া গাইড
বাংলাদেশে প্রতিদিন কোটি মানুষ জ্বর, গ্যাস্ট্রিক, শ্বাসকষ্ট ও এলার্জির জন্য বিভিন্ন ওষুধ সেবন করেন। যেকোনো ওষুধের সর্বোচ্চ সুফল পেতে এর সঠিক ডোজ, খাবারের আগে বা পরে খাওয়ার নিয়ম এবং সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া জানা অত্যন্ত জরুরি। নিচে বাংলাদেশে সর্বাধিক প্রচলিত প্রয়োজনীয় ওষুধের নির্ভরযোগ্য তথ্য সংকলন করা হলো।
জরুরি স্বাস্থ্য সতর্কতা: প্রেসক্রিপশন ছাড়া ওষুধ নয়
ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া কোনো অ্যান্টিবায়োটিক বা প্রেসক্রিপশন ওষুধ সেবন করবেন না। এখানে প্রদত্ত তথ্য কেবল সাধারণ স্বাস্থ্য সচেতনতা ও সঠিক নিয়মে সেবনের নির্দেশিকা হিসেবে তৈরি করা হয়েছে; এটি কোনোভাবেই চিকিৎসকের সরাসরি প্রেসক্রিপশন বা বিকল্প নয়।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ ও চেম্বার শিডিউল জানতে আমাদের কনসালট্যান্ট ডিরেক্টরি দেখুন। হেলথ ক্লাব মেম্বারশিপে নির্ধারিত পার্টনার ল্যাবে পাচ্ছেন ১০-৩০% মেম্বার ছাড়।
Paracetamol (Acetaminophen)
পরিচিত ব্র্যান্ড:
প্যারাসিটামল হলো বাংলাদেশ ও বিশ্বব্যাপী বহুল ব্যবহৃত নিরাপদ জ্বর ও ব্যথানাশক ওষুধ। প্রাপ্তবয়স্কদের আদর্শ ডোজ ৫০০ থেকে ১,০০০ মিলিগ্রাম প্রতি ৪-৬ ঘণ্টা পরপর (২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৪ গ্রাম)। অতিরিক্ত সেবনে লিভারের মারাত্মক ক্ষতি (হেপাটোটক্সিসিটি) হতে পারে। ডেঙ্গু জ্বর ও সাধারণ সর্দি-জ্বরে এটি প্রথম সারির নির্দেশিত ওষুধ।
Omeprazole & Esomeprazole
পরিচিত ব্র্যান্ড:
ওমিপ্রাজল ও এসোমিপ্রাজল হলো পাকস্থলীর অতিরিক্ত এসিড উৎপাদনকারী এনজাইম পাম্প সাময়িকভাবে নিষ্ক্রিয়কারী পিপিআই ওষুধ। এটি খাওয়ার সঠিক নিয়ম হলো সকালে নাস্তার ৩০ থেকে ৬০ মিনিট পূর্বে খালি পেটে এক গ্লাস পানি দিয়ে সম্পূর্ণ গিলে খাওয়া। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া টানা মাসের পর মাস খাওয়া অস্টিওপোরোসিস ও ম্যাগনেসিয়াম ঘাটতির কারণ হতে পারে।
Pantoprazole
পরিচিত ব্র্যান্ড:
প্যান্টোপ্রাজল হলো আধুনিক দ্বিতীয় প্রজন্মের প্রোটন পাম্প ইনহিবিটর (PPI), যা পাকস্থলীর অতিরিক্ত এসিড নিঃসরণ বন্ধ করে গ্যাস্ট্রিক আলসার, রিফ্লাক্স (GERD) ও বুকজ্বালা নিরাময় করে। এটি সকালের খাবারের ৩০-৬০ মিনিট পূর্বে দিনে ১ বার সেব্য। অন্যান্য ওষুধের সাথে এর ড্রাগ ইন্টারঅ্যাকশনের ঝুঁকি ওমেপ্রাজলের চেয়ে কম।
Rabeprazole
পরিচিত ব্র্যান্ড:
রেবিপ্রাজল হলো দ্রুত কার্যক্ষম প্রোটন পাম্প ইনহিবিটর (PPI), যা সেবনের মাত্র ১ ঘণ্টার মধ্যে পাকস্থলীর এসিড নিয়ন্ত্রণ শুরু করে। এটি তীব্র বুকজ্বালা, টক ঢেকুর ও পেপটিক আলসার উপশমে ২০ মিগ্রা ডোজে প্রতিদিন সকালে খালি পেটে সেবন করা হয়। এটি লিভার এনজাইমের উপর নির্ভরশীল নয় বলে ওষুধের পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া খুব কম।
Montelukast Sodium
পরিচিত ব্র্যান্ড:
মন্টেলুকাস্ট হলো একটি কার্যকর লিউકોટ্রাইন ব্লকার, যা অ্যালার্জিজনিত নাক বন্ধ, হাঁচি এবং দীর্ঘমেয়াদী অ্যাজমা বা হাঁপানির টান নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত হয়। প্রাপ্তবয়স্কদের সাধারণ ডোজ ১০ মিলিগ্রাম রাতে ঘুমানোর পূর্বে। এটি কোনো জরুরি রেসকিউ ওষুধ নয়। বিরল ক্ষেত্রে মেজাজ খিটখিটে হওয়া বা দুঃস্বপ্নের মতো আচরণগত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে।
Oral Rehydration Salts (ORS)
পরিচিত ব্র্যান্ড:
ওরস্যালাইন-এন হলো ডায়রিয়া, পাতলা পায়খানা ও বমিজনিত মারাত্মক পানিশূন্যতা প্রতিরোধের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সেরা জীবনরক্ষাকারী সমাধান। এটি তৈরির অমোঘ নিয়ম: সম্পূর্ণ ১ প্যাকেট স্যালাইন ৫০০ মিলি (আধ লিটার) ফুটানো ঠাণ্ডা পানিতে গুলে বানাতে হবে। গরম পানিতে মেশানো বা কম পানি দেওয়া শিশুর মস্তিষ্কে লবণের মারাত্মক বিষক্রিয়া ঘটাতে পারে।
Fexofenadine & Bilastine
পরিচিত ব্র্যান্ড:
ফেক্সোফেনাডিন ও বিলাস্টিন হলো আধুনিক নন-সিডেটিং অ্যান্টিহিস্টামিন, যা খেলে পুরনো সর্দির ওষুধের মতো ঘুম ঘুম ভাব বা ঝিমুনি তৈরি হয় না। বিলাস্টিন ২০ মিগ্রা দৈনিক ১ বার খাওয়ার নিয়ম হলো খাবারের ১ ঘণ্টা আগে অথবা খাবারের ২ ঘণ্টা পরে সম্পূর্ণ খালি পেটে পানির সাথে খাওয়া। ফলের জুসের সাথে খেলে এদের কার্যকারিতা কমে যায়।
Levocetirizine Dihydrochloride
পরিচিত ব্র্যান্ড:
লেভোসেট্রিজিন হলো আধুনিক তৃতীয় প্রজন্মের অ্যান্টিহিস্টামিন, যা ধুলাবালি বা ঋতু পরিবর্তনের অ্যালার্জি, হাঁচি, নাক দিয়ে পানি পড়া ও ত্বকের তীব্র চুলকানি দূর করে। প্রাপ্তবয়স্কদের ডোজ ৫ মিগ্রা দিনে ১ বার রাতে। পুরাতন অ্যান্টিহিস্টামিনের তুলনায় এটি মস্তিষ্কে কম প্রবেশ করায় এতে অতিরিক্ত ঘুম বা তন্দ্রাভাবের ঝুঁকি অনেক কম।
Doxophylline
পরিচিত ব্র্যান্ড:
ডক্সোফাইলিন হলো আধুনিক ব্রঙ্কোডাইলেটর যা ব্রঙ্কিয়াল অ্যাজমা ও সিওপিডি (COPD) রোগীদের ফুসফুসের শ্বাসনালি প্রসারিত করে শ্বাসকষ্ট দূর করে। প্রাপ্তবয়স্কদের ডোজ ৪০০ মিগ্রা দিনে ২-৩ বার। পুরাতন থিওফাইলিনের তুলনায় এর কার্ডিয়াক ও গ্যাস্ট্রিক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া (যেমন বুক ধড়ফড় বা বমি) অনেক কম।
Azithromycin (Macrolide Antibiotic)
পরিচিত ব্র্যান্ড:
অ্যাজিথ্রোমাইসিন হলো একটি শক্তিশালী ম্যাক্রোলাইড অ্যান্টিবায়োটিক যা কেবলমাত্র সুনির্দিষ্ট ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। সাধারণ ভাইরাসজনিত সর্দি, কাশি বা মৌসুমি ফ্লু-তে অ্যান্টিবায়োটিক কোনো কাজ করে না। কোর্স শেষ না করে মাঝপথে ওষুধ বন্ধ করলে জীবাণু প্রতিরোধী (অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স) হয়ে যায়।
Metronidazole
পরিচিত ব্র্যান্ড:
মেট্রোনিডাজল হলো অ্যামিবিক আমাশয় (Amoebiasis), জিয়ার্ডিয়াসিস, দাঁতের মাড়ির ইনফেকশন ও পেটের অ্যানারোবিক ব্যাকটেরিয়া নিরাময়ে ব্যবহৃত একটি কার্যকর ওষুধ। এটি খাওয়ার প্রধান নিয়ম হলো খাবারের ঠিক পরে ভরা পেটে খাওয়া। ওষুধ চলাকালীন অ্যালকোহল গ্রহণ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ (ডিসালফিরাম রিঅ্যাকশন)।
Ciprofloxacin (Fluoroquinolone Antibiotic)
পরিচিত ব্র্যান্ড:
সিপ্রোফ্লক্সাসিন হলো মূত্রনালীর ইনফেকশন (UTI), জটিল পাতলা পায়খানা ও টাইফয়েড নিরাময়ের একটি শক্তিশালী ব্রড-স্পেকট্রাম অ্যান্টিবায়োটিক। এটি দুধ, দুগ্ধজাত খাবার বা অ্যান্টাসিডের সাথে খেলে ওষুধ অকার্যকর হয়ে যায়। ওষুধ চলাকালীন প্রচুর পানি পান করা আবশ্যক এবং পেশিতে কোনো টান বা ব্যথা হলে সাথে সাথে ওষুধ বন্ধ করতে হবে।
Cefixime (3rd Gen Cephalosporin)
পরিচিত ব্র্যান্ড:
সেফিক্সিম হলো শিশুদের ও বড়দের টাইফয়েড জ্বর, মূত্রনালীর সংক্রমণ (UTI) ও ফুসফুসের ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশনে বহুল ব্যবহৃত একটি নিরাপদ ৩য় প্রজন্মের অ্যান্টিবায়োটিক। প্রাপ্তবয়স্কদের সাধারণ ডোজ ৪০০ মিলিগ্রাম দৈনিক ১ বার বা ২০০ মিগ্রা দিনে ২ বার টানা ৭-১৪ দিন। খাবারের সাথে খেলে পেটের অস্বস্তি কমে।
Amoxicillin and Clavulanic Acid
পরিচিত ব্র্যান্ড:
অ্যামোক্সিসিলিন ও ক্লাভুলানিক অ্যাসিড হলো একটি ব্রড-স্পেকট্রাম অ্যান্টিবায়োটিক কম্বিনেশন, যা সাধারণ পেনিসিলিন-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ ধ্বংস করে। এটি কান-গলা-নাকের তীব্র সংক্রমণ, নিউমোনিয়া, সাইনোসাইটিস ও ত্বকের জটিল ইনফেকশনে কার্যকর। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পূর্ণ কোর্স শেষ করা বাধ্যতামূলক; মাঝপথে বন্ধ করলে সুপারবাগ অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স তৈরি হয়।
Doxycycline
পরিচিত ব্র্যান্ড:
ডক্সিসাইক্লিন হলো একটি শক্তিশালী টেট্রাসাইক্লিন শ্রেণির অ্যান্টিবায়োটিক, যা ব্রঙ্কাইটিস, তীব্র ব্রন (Acne), যৌন সংক্রামক রোগ (Chlamydia) ও রোদে পোড়া স্ক্রাব টাইফাস নিরাময়ে কার্যকর। প্রাপ্তবয়স্কদের ডোজ ১০০ মিগ্রা দিনে ১-২ বার। এটি সেবনের পর অন্তত ৩০ মিনিট শোয়া যাবে না, অন্যথায় খাদ্যনালিতে মারাত্মক ক্ষত (Esophageal Ulcer) হতে পারে।
Cefuroxime Axetil
পরিচিত ব্র্যান্ড:
সেফুরোক্সিম হলো শক্তিশালী দ্বিতীয় প্রজন্মের সেফালোস্পোরিন অ্যান্টিবায়োটিক, যা টনসিলাইটিস, নিউমোনিয়া, মূত্রনালির ইনফেকশন (UTI) ও টাইফয়েড পরবর্তী জটিলতায় ব্যবহৃত হয়। প্রাপ্তবয়স্কদের সাধারণ ডোজ ২৫০-৫০০ মিগ্রা দিনে ২ বার খাবারের পর। ওষুধটির শোষণ বাড়াতে ও পেটের অস্বস্তি কমাতে এটি অবশ্যই ভরা পেটে সেব্য।
Aceclofenac
পরিচিত ব্র্যান্ড:
এসেক্লোফেনাক হলো একটি শক্তিশালী এনএসএআইডি (NSAID) শ্রেণির ব্যথানাশক, যা হাড়ের জয়েন্টের প্রদাহ, বাতব্যথা ও তীব্র ব্যাকপেইনে কার্যকর। প্রাপ্তবয়স্কদের আদর্শ ডোজ ১০০ মিগ্রা দিনে ২ বার ভরা পেটে। এটি পাকস্থলীতে ঘা ও কিডনির ক্ষতি করতে পারে, তাই সবসময় চিকিৎসকের পরামর্শে গ্যাস্ট্রিকের ওষুধসহ সর্বনিম্ন মেয়াদে সেব্য।
Naproxen Sodium
পরিচিত ব্র্যান্ড:
ন্যাপ্রোক্সেন হলো একটি দীর্ঘস্থায়ী কার্যক্ষম এনএসএআইডি (NSAID) শ্রেণির ব্যথানাশক, যা তীব্র মাইগ্রেন, গাঁটের বাতব্যথা ও মাসিকের তীব্র পেটব্যথা উপশমে কার্যকর। এর একটি ডোজ ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত ব্যথা নিয়ন্ত্রণে রাখে। হৃদরোগের ঝুঁকিতে অন্যান্য এনএসএআইডির চেয়ে এটি তুলনামূলক নিরাপদ হলেও পাকস্থলীতে আলসারের ঝুঁকি তৈরি করে।
বাকি রয়েছে আরও 84টি ওষুধের পূর্ণাঙ্গ গাইড
শিশুর ওজন অনুযায়ী প্যারাসিটামল সিরাপ ডোজ ক্যালকুলেটর
১২০ মিগ্রা / ৫ মিলি সিরাপের (নাপা, এইস সিরাপ) বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনুমোদিত ক্লিনিক্যাল ফর্মুলা
৩ থেকে ৪০ কেজির মধ্যে ওজন প্রদান করুন।
জরুরি শিশু সতর্কতা: শিশুর বয়স ৩ মাসের কম হলে ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন ছাড়া কখনোই কোনো ওষুধ দেবেন না। শিশুর জ্বর ১০২° ফারেনহাইটের বেশি হলে বা ৩ দিনের বেশি স্থায়ী হলে অবিলম্বে শিশু বিশেষজ্ঞ দেখান।
ওষুধ সেবনের ৪টি জীবনরক্ষাকারী সুবর্ণ নিয়ম (Golden Rules of Safe Medication)
সঠিক ওষুধও ভুল সময়ে বা ভুল তরলের সাথে সেবন করলে বিষের মতো কাজ করতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আলোকে নিচের নিয়মগুলো সবসময় মেনে চলুন।
খালি পেট বনাম ভরা পেটের বিজ্ঞান
গ্যাস্ট্রিকের পিপিআই (সেক্লো) নাস্তার ৩০ মিনিট আগে এবং বিলাস্টিন খালি পেটে খাওয়া বাধ্যতামূলক। অন্যদিকে ব্যথানাশক (প্যারাসিটামল) ও মেটফরমিন সবসময় ভরা পেটে খাওয়া উচিত যাতে পাকস্থলীর মিউকোসা সুরক্ষিত থাকে।
শুধু বিশুদ্ধ সাধারণ পানি দিয়ে ওষুধ সেবন
কখনোই চা, কফি, দুধ, লেবুর শরবত বা কমলার জুস দিয়ে ওষুধ গিলবেন না। ফলের জুস অ্যালার্জির ওষুধ (ফেক্সো/বিলাস্টিন) এবং দুধ অ্যান্টিবায়োটিকের (সিপ্রোসিন) শোষণ প্রায় ৭০-৯০% পর্যন্ত নষ্ট করে দেয়।
অ্যান্টিবায়োটিকের পূর্ণ কোর্স সমাপ্ত করা
২ দিন ওষুধ খেয়ে জ্বর বা ব্যথা কমে গেলেও ডাক্তারের নির্দেশিত পূর্ণ ৩, ৫ বা ৭ দিনের কোর্স কখনোই অসম্পূর্ণ রাখা যাবে না। কোর্স অসম্পূর্ণ রাখলে ব্যাকটেরিয়া ওষুধ প্রতিরোধী (Superbug) হয়ে ভবিষ্যতে মহাবিপদ ডেকে আনে।
মেয়াদোত্তীর্ণ ও আর্দ্রতায় নষ্ট ওষুধের ঝুঁকি
স্ট্রিপ কাটার পর ট্যাবলেট বা ক্যাপসুল আর্দ্রতা পেলে দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। বিশেষ করে খাবার স্যালাইন বা অ্যান্টিবায়োটিক সাসপেনশন প্রস্তুত করার নির্ধারিত সময় (স্যালাইন ১২ ঘণ্টা, সিরাপ ৫-৭ দিন) পর ফেলে দিতে হবে।
ঘরে ফার্স্ট এইড ও প্রাথমিক মেডিসিন বক্সে কী কী থাকা আবশ্যক? (Home First Aid Checklist)
হঠাৎ গভীর রাতে বা ছুটির দিনে পরিবারে প্রাথমিক অসুস্থতায় জরুরি পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রতিটি ঘরে একটি সুরক্ষিত ওটিসি মেডিসিন বক্স রাখা প্রয়োজন।
প্রাথমিক জ্বর ও ব্যথা
- প্যারাসিটামল ৫০০ মিগ্রা ট্যাবলেট (প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য)
- বাচ্চাদের প্যারাসিটামল সিরাপ (১২০ মিগ্রা/৫ মিলি) ও ড্রপার
টিপ:জ্বর ১০১° এর বেশি হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন
ডায়রিয়া ও পানিশূন্যতা
- ওরস্যালাইন-এন (৫-১০টি প্যাকেট)
- ৫০ মিলি পরিমাপের চামচ বা গ্লাস
টিপ:সর্বদা ৫০০ মিলি ফুটানো ঠান্ডা পানিতে গুলবেন
গ্যাস্ট্রিক ও বদহজম
- অ্যান্টাসিড প্লাস সিরাপ বা চিউয়েবল ট্যাবলেট
- পিপিআই ওমিপ্রাজল ২০ মিগ্রা ক্যাপসুল
টিপ:টানা ১৪ দিনের বেশি গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ খাওয়া নিষেধ
অ্যালার্জি ও সর্দি
- ফেক্সো ১২০ মিগ্রা বা বিলাস্টিন ২০ মিগ্রা ট্যাবলেট
- নরমাল স্যালাইন ন্যাজাল ড্রপস (নাক বন্ধ হলে)
টিপ:ঘুম ঘুম ভাব তৈরি করে না এমন নন-সিডেটিং ওষুধ রাখুন
কাটা-ছেঁড়া ও ফার্স্ট এইড
- পোভিডন আয়োডিন ১% দ্রবণ বা মলম
- জীবাণুমুক্ত গজ ব্যান্ডেজ, তুলা ও মাইক্রোপোর টেপ
টিপ:আহত স্থান পরিষ্কার পানি দিয়ে ধুয়ে আয়োডিন লাগান
মেডিকেল ডিভাইস
- ডিজিটাল থার্মোমিটার (শরীরের তাপমাত্রা মাপার জন্য)
- রক্তচাপ মাপার ডিজিটাল বিপি মেশিন (বয়স্কদের পরিবারে)
টিপ:থার্মোমিটার ব্যবহারের পর অ্যালকোহল প্যাড দিয়ে মুছুন
মেডিসিন বক্সের সতর্কতা: ওষুধের বক্সটি অবশ্যই শিশুদের নাগালের বাইরে উঁচু স্থানে রাখুন। প্রতি ৩ মাস পরপর বক্সের ওষুধের মেয়াদ (Expiry Date) পরীক্ষা করুন এবং কোনো অ্যান্টিবায়োটিক অবশিষ্ট থাকলে তা বক্সে জমিয়ে রাখবেন না।
ওষুধ সেবন নিয়ে সাধারণ মানুষের জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)
Q.ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া ফার্মেসি থেকে নিজে নিজে ওষুধ কেনা কতটা বিপজ্জনক?
বাংলাদেশে প্রেসক্রিপশন ছাড়া যেকোনো ওষুধ কেনা সহজ হলেও অ্যান্টিবায়োটিক, ব্যথানাশক বা স্টেরয়েড নিজে নিজে খাওয়া অত্যন্ত বিপজ্জনক। এতে লিভার-কিডনির স্থায়ী ক্ষতি, পেটে রক্তক্ষরণ এবং অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স তৈরি হয়। শুধুমাত্র প্যারাসিটামল বা খাবার স্যালাইনের মতো ওটিসি ওষুধ প্রাথমিক লক্ষণের জন্য স্বল্পমেয়াদে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া গ্রহণ করা যেতে পারে।
Q.ওষুধের ব্র্যান্ড নাম এবং জেনেরিক নামের মধ্যে পার্থক্য কী?
জেনেরিক হলো ওষুধের মূল কার্যকরী রাসায়নিক উপাদান (যেমন: Paracetamol), আর ব্র্যান্ড হলো ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি কর্তৃক দেওয়া বাজারজাত নাম (যেমন: Napa, Ace)। বিভিন্ন কোম্পানির ব্র্যান্ড নাম ও দাম ভিন্ন হলেও মূল জেনেরিক উপাদান এবং তাদের চিকিৎসাগত কার্যকারিতা অভিন্ন থাকে।
Q.গর্ভাবস্থায় যেকোনো ওষুধ খাওয়ার পূর্বে কেন সতর্কতা জরুরি?
গর্ভাবস্থায় অনেক সাধারণ ওষুধ প্লাসেন্টা ভেদ করে ভ্রূণের রক্তে প্রবেশ করতে পারে, যা গর্ভস্থ শিশুর অঙ্গ গঠনে জন্মগত ত্রুটি (Teratogenicity) সৃষ্টি করতে পারে। তাই এফডিএ ক্যাটাগরি B বা চিকিৎসকের সরাসরি লিখিত অনুমোদন ছাড়া গর্ভবতী নারীদের কোনো ওষুধ খাওয়া একেবারেই উচিত নয়।
Q.অ্যান্টিবায়োটিক কোর্স মাঝপথে বন্ধ করলে কী মারাত্মক ক্ষতি হয়?
২-৩ দিন ওষুধ খাওয়ার পর উপসর্গ কমে গেলেও শরীরে লুকিয়ে থাকা শক্তিশালী ব্যাকটেরিয়াগুলো সম্পূর্ণ ধ্বংস হয় না। কোর্স অসম্পূর্ণ রাখলে সেই ব্যাকটেরিয়াগুলো ওষুধ প্রতিরোধী (Antibiotic Resistant) হয়ে ওঠে; যার ফলে পরবর্তীতে ওই অ্যান্টিবায়োটিক আর কোনো কাজ করে না।